মাদক সাম্রাজ্য ও আধিপত্য বিস্তারে ব্যবহৃত হচ্ছে লুটের অস্ত্র
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন থানা, পুলিশ ফাঁড়ি ও কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো রয়ে গেছে অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণে। উদ্ধার না হওয়া এসব আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র এখন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আধিপত্য বিস্তার, মাদক সিন্ডিকেটের দখলদারিত্ব, ভাড়াটে হামলা ও চাঁদাবাজির মতো মারাত্মক অপরাধে ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্র প্রদর্শন এবং অপরাধীদের কাছে চড়া মূল্যে অস্ত্র ভাড়া ও কেনাবেচার মতো বেপরোয়া তৎপরতাও ধরা পড়ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জালে।
সম্প্রতি রাজধানীর গাবতলীতে ট্রাফিক পুলিশের সংকেত অমান্য করে পালানোর সময় একটি হলুদ স্পোর্টস কার থেকে সাজ্জাদ হোসেন আশিক নামের এক যুবককে বিদেশি পিস্তলসহ আটক করা হয়। উদ্ধারকৃত ব্রাজিলিয়ান ৯ এমএম সেমি অটোমেটিক অস্ত্রটিতে 'বিপি-এমটিসিএল' খোদাই করা ছিল, যা সাধারণত পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দ থাকে। তদন্তে উঠে আসে, ধানমন্ডির একটি গ্রুপের সঙ্গে বিরোধের জেরে শাহরিয়ার চৌধুরী নামের এক ব্যক্তি চার লাখ টাকায় সন্ত্রাসী চক্রের কাছ থেকে পুলিশের এই অস্ত্রটি সংগ্রহ করেছিলেন।
একইভাবে স্বামীবাগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শকের ওপর গুলির ঘটনার তদন্তে নেমে শীর্ষ মাদক কারবারি অটো সজল ও তার ভাই সজীবের চক্রের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় বেশ কয়েকটি অস্ত্র। যার মধ্যে চারটিই ছিল ওয়ারী থানা থেকে লুট হওয়া। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সজল এসব অস্ত্র নিজের মাদক সাম্রাজ্য রক্ষার পাশাপাশি মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে অন্য অপরাধীদের কাছে ভাড়াও দিত। সর্বশেষ গত রবিবার গেন্ডারিয়ার মুন্সিরটেকে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণে এক নারীসহ তিনজন আহত হন। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া ২০টি গুলির খোসা বিশ্লেষণ করে পুলিশ ধারণা করছে, ওই এলাকায় আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে কিংবা নতুন গ্যাংয়ের উত্থান ঘটাতেও ব্যবহৃত হয়েছে এই লুটের অস্ত্র।
পুলিশ সদর দপ্তরের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গণ-অভ্যুত্থানের সময় সারাদেশে মোট ৫ হাজার ৭৬৩টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র লুট হয়েছিল। গত ২৫ আগস্ট পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ৪ হাজার ৪৫৩টি অস্ত্র উদ্ধার সম্ভব হলেও এখনো ১ হাজার ৩১০টি অত্যাধুনিক অস্ত্র রয়েছে অপরাধীদের দখলে। উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে ১০৯টি চায়না রাইফেল, একটি বিডি রাইফেল, ৩০টি এসএমজি, তিনটি এলএমজি, ২০৩টি ৭.৬২ চায়না পিস্তল, ৪৪৩টি ৯ এমএম পিস্তল, ৩৮৪টি শটগান এবং গ্যাস গান ও লঞ্চারসহ নানা ধরনের অস্ত্র। এছাড়া ২ লাখ ৪৩ হাজার ৮০০ রাউন্ড তাজা গুলি এবং টিয়ার গ্যাস শেল ও সাউন্ড গ্রেনেডসহ প্রায় ১৪ হাজার বিশেষ সামরিক সরঞ্জাম এখনো বাইরে রয়ে গেছে।
অস্ত্র উদ্ধারের এই পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় র্যাবের নেতৃত্বে যৌথ অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, উদ্ধার না হওয়া অস্ত্র হাতবদল ও অপব্যবহার রোধে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট, বিশেষ শাখা (এসবি) এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাকে সমন্বিত করে অভিযান গতিশীল করা হচ্ছে। পাশাপাশি লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্যের জন্য ১০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত নগদ আর্থিক পুরস্কারের ঘোষণাও দিয়েছে সরকার।