মান্দায় দলিল জালিয়াতি করে গোডাউন গুঁড়িয়ে লুটপাট, বালামে গড়মিল পেয়েও অধরা অভিযুক্তরা
নওগাঁর মান্দায় দলিলের হাতনকশা (দখল পজিশন) ওভাররাইটিং ও কাটাকাটি করে এক ব্যবসায়ীর বৈধ জমি জবরদখলের অপচেষ্টা, ভারী যন্ত্র (ভেকু) দিয়ে পাকা টিনশেড গোডাউন গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং ভেতরে থাকা বিপুল মালামাল লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি সরকারি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মূল বালাম বই যাচাই করে বিবাদীদের দলিলের তথ্য জালিয়াতির সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলেও অজ্ঞাত কারণে এখনো গ্রেপ্তার হয়নি অভিযুক্তরা। এতে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী।
ঘটনায় স্থানীয় বিজিবি সদস্য আব্দুল মান্নান ও তাঁর ভাই সাবেক ইউপি সদস্য মোকলেছার রহমানের বিরুদ্ধে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী মো. আমিনুল হক বাদী হয়ে সংশ্লিষ্টদের নাম উল্লেখ করে মান্দা থানায় একটি লিখিত এজাহার দায়ের করেছেন।
অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দেলুয়াবাড়ী মৌজার ৩১৩ নম্বর খতিয়ানের ৭৫৯ নম্বর দাগের পৌনে ১৩ শতক জমি ২০২১ সালে বৈধভাবে কেনেন ব্যবসায়ী আমিনুল হক। পরে নিজের নামে খারিজ (নামজারি) সম্পন্ন ও নিয়মিত সরকারি খাজনা পরিশোধ করে নিচু জমিটি ভরাট করেন তিনি। সেখানে ব্যবসা পরিচালনার জন্য একটি সুপরিসর টিনশেড গোডাউন নির্মাণ করে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন।
অভিযোগে প্রকাশ, বিজিবি সদস্য আব্দুল মান্নান ও তাঁর ভাই সাবেক ইউপি সদস্য মোকলেছার রহমান একটি স্বার্থান্বেষী মহলের যোগসাজশে দলিলের হাতনকশার চৌহদ্দিতে ঘষামাজা ও ওভাররাইটিং করে ওই জমিটি দখলের পাঁয়তারা শুরু করেন। এর ধারাবাহিকতায় গত ১৯ আগস্ট সকালে ভাড়াটে বাহিনী নিয়ে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অতর্কিত হামলা চালানো হয়। এ সময় একটি বড় ভেকু দিয়ে গোডাউনটি সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই গোডাউনে থাকা বিপুল পরিমাণ ভাঙাড়ি মালামাল ও লোহার সামগ্রী লুটপাট করা হয় এবং অবশিষ্ট অংশ মাটিচাপা দিয়ে ধ্বংস করা হয়।
পরবর্তীতে ওই দিন রাতে থানা চত্বরে উভয় পক্ষকে নিয়ে অনুষ্ঠিত সমঝোতা বৈঠকে অভিযুক্তরা আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার অঙ্গীকার করে লিখিত মুচলেকা দেন। তবে থানা থেকে বের হয়েই তারা ফের রাতের আঁধারে জমিতে খুঁটি ও ইট পুঁতে দখলের অপচেষ্টা চালান।
পরবর্তীতে উপজেলা ও পুলিশ প্রশাসনের উপস্থিতিতে প্রসাদপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের মূল বালাম বই খতিয়ে দেখা হয়। সেখানে স্পষ্ট উঠে আসে, অভিযুক্তদের দাবিকৃত দলিলের সঙ্গে সরকারি মূল বালাম বইয়ের চৌহদ্দির কোনো মিল নেই এবং মূল নথিতে কৌশলে ওভাররাইটিং করে মারাত্মক তথ্য জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আমিনুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যাবতীয় বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ভেকু নামিয়ে তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দিয়ে অন্তত ১২ লাখ টাকারও বেশি আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে। সরকারি নথিতে জালিয়াতির প্রমাণ মেলার পরও পুলিশ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় তিনি সুষ্ঠু বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। এদিকে ঘটনার পর থেকে অভিযুক্তদের বাড়িতে না পাওয়ায় এবং তাদের ব্যবহৃত ফোন নম্বর বন্ধ থাকায় এ বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোরশেদ আলম জানান, ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর লিখিত অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রসাদপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের তদন্ত প্রতিবেদন ও মূল বালাম বইয়ের অসঙ্গতির বিষয়টি আইনি পর্যালোচনায় রয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে জালিয়াতি ও ভাঙচুরে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।