ভুয়া রপ্তানি বিলে শতকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
রূপালী ব্যাংকের খুলনা বিভাগে দায়িত্ব পালনকালীন প্রায় ১৯০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তলবের মুখে পড়েছিলেন রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) বর্তমান মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও পরিচালন) মো. তাজ উদ্দীন আহম্মদ। সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধানের নথিপত্র প্রকাশ্যে আসার পর বিশেষায়িত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির শীর্ষ পর্যায়ের এই কর্মকর্তার অতীত ভূমিকা ও বর্তমান অবস্থান নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় খুলনা থেকে জারি করা এক তলবপত্রের মাধ্যমে তাঁকে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
দুদকের অনুসন্ধান নথির তথ্য অনুযায়ী, রূপালী ব্যাংকের খুলনার একটি করপোরেট শাখায় কয়েকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে ভুয়া রপ্তানি বিল সৃষ্টির মাধ্যমে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা এবং সরকারের নগদ সহায়তার অতিরিক্ত প্রায় ৪০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট সময়ের বিভাগীয় প্রধান ও কর্মকর্তাদের দায়িত্বের পরিধি খতিয়ে দেখতে অনুসন্ধান শুরু করে সংস্থাটি। ওই চিঠিতে তাজ উদ্দীন আহম্মদের দায়িত্বকাল হিসেবে ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ২৯ মার্চ পর্যন্ত সময়কাল সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় এবং একই সঙ্গে তৎকালীন সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যাংক কর্মকর্তাদেরও বক্তব্য দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
তবে এই তলব কোনো চূড়ান্ত দণ্ডাদেশ বা আদালতে প্রমাণিত দুর্নীতির রায় নয়; বরং এটি ছিল অভিযোগ তদন্তের প্রাথমিক প্রক্রিয়া। তাজ উদ্দীন আহম্মদ ২০২৪ সালে রূপালী ব্যাংক থেকে পদোন্নতি ও বদলি সূত্রে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে (রাকাব) মহাব্যবস্থাপক পদে যোগ দেন। ২০২৬ সালের হালনাগাদ দাপ্তরিক নথিপত্র অনুযায়ী, তিনি বর্তমানে ব্যাংকটির প্রশাসন ও পরিচালন মহাবিভাগের মতো অতি সংবেদনশীল ও নীতিনির্ধারণী পদে বহাল রয়েছেন। এমনকি ২০২৬ সালের এপ্রিলে ব্যাংকের বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. গোলাম মরতুজার সঙ্গেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি দেখা গেছে। এ অবস্থায় একটি রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকের শীর্ষ প্রশাসনিক পদে থাকা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার আর্থিক অনিয়মে দুদকের অনুসন্ধান কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাকাবে কেবল তাজ উদ্দীন আহম্মদের অতীত কর্মস্থলের অভিযোগই নয়, ব্যাংকটির সার্বিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও ভারপ্রাপ্ত এমডি মো. গোলাম মরতুজার ভূমিকা নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। বদলি ও পদায়নে বিশেষ পক্ষপাত, নিজস্ব বলয়ের কর্মকর্তাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া, অনিয়মিত উপস্থিতি এবং ব্যাংক ভবনের অননুমোদিত আবাসিক ব্যবহারসহ একাধিক প্রশাসনিক অসঙ্গতির কথা অভ্যন্তরীণ পরিসরে আলোচিত হচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগের কোনোটিই কোনো তদন্তকারী সংস্থা বা আদালতে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিষ্পত্তি হয়নি। এর আগে ২০২৪ সালে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে রাকাব কর্মকর্তাদের মধ্যাহ্নভোজ ভাতা বাবদ ৪ কোটি ২৩ লাখ ৫৭ হাজার টাকার বেশি অনিয়মিত ব্যয়ের আপত্তির জবাব অসন্তোষজনক থাকার তথ্যও প্রকাশ্যে এসেছিল।
রূপালী ব্যাংকের সেই আর্থিক অনিয়মের বিস্তৃতি বিবেচনা করলে দেখা যায়, ভুয়া রপ্তানি বিল তৈরি, পণ্যের বাস্তব চালান নিশ্চিত না করে অর্থ ছাড়, নথি যাচাই ও নগদ সহায়তা অনুমোদনের প্রতিটি স্তরে প্রশাসনিক জবাবদিহি ছিল কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা অপরিহার্য। বিশেষ করে তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান হিসেবে তাজ উদ্দীন আহম্মদের তদারকি বা অনুমোদনসংক্রান্ত কী ধরনের ভূমিকা ছিল, সেটিই মূল অনুসন্ধানের বিষয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক মো. তাজ উদ্দীন আহম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, দুদকের কোনো তলবপত্র বা চিঠি তিনি পাননি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, যে অনিয়মের কথা বলা হচ্ছে তা হয়তো অন্য কোনো মহাব্যবস্থাপকের আমলের ঘটনা হতে পারে এবং এর সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এরপর একটি দাপ্তরিক বৈঠকের কথা জানিয়ে তিনি ফোনের সংযোগ কেটে দেন।
এ বিষয়ে রূপালী ব্যাংকের খুলনা বিভাগের খান-এ-সবুর রোড শাখার অবসরপ্রাপ্ত সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) গোলাম মোর্শেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিশ্চিত করেন যে, তাজ উদ্দীন আহম্মদ রূপালী ব্যাংকের খুলনা বিভাগের মহাব্যবস্থাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে উল্লিখিত সময়ে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তবে দুদকের অনুসন্ধান বা চিঠি প্রেরণের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তাঁর কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই বলে জানান।
এদিকে খুলনার সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা শেষে দুদকের সহকারী পরিচালক ও অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা রকিবুল ইসলাম ইতোমধ্যেই একটি অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রধান কার্যালয়ে জমা দিয়েছেন। প্রতিবেদনটি বর্তমানে কমিশনে পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং পরবর্তীতে কমিশন থেকে অনুমোদন পেলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি পদক্ষেপ বা নিয়মিত মামলার সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এ ব্যাপারে অনুসন্ধানের অগ্রগতি জানতে দুদকের সহকারী পরিচালক রকিবুল ইসলামের সরকারি মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।